পরিবার-পরিজন এর মায়া ত্যাগ করে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর যায় এদেশের বেকাপ তরুণ-যুবকরা সেখানে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়তে ব্যস্ত থাকে তারা দেশ থেকে অনেক কষ্ট করে টাকা পয়সা জোগাড় করে তারা এই ভিনদেশে আসে এবং লেগে পড়ে অর্থ উপার্জনের জন্য তাদের আশা মূলত একটাই থাকে কিভাবে তাদের এই কষ্ট অর্জিত পয়সা দিয়ে তারা তাদের পরিবারের মুখে সচ্ছলতার হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবার তাদের এই কষ্ট কে মূল্যায়ন করেনা এবং প্রতিনিয়ত তাদের চাহিদা আরো বাড়তে থাকে


এক ভদ্রলোক, আমি তাকে চিনিনা। মোবাইলে ট্রেনে বসে কথা বলতে বলতে কেঁদে দিলেন। বাপ-মা ভাইবোনের দাবির চাপে তিনি কোণঠাসা হয়ে আছেন। দেশে টাকা পাঠানোর জন্য নিজের সখ আহ্লাদ সব বলি দিয়েছেন তবুও টাকার ডিমান্ড আর শেষ হয় নি।

তিনি যে তার সবটা ছেড়ে দিয়ে মাসে ত্রিশ হাজার পাঠাচ্ছেন তা বাসার কেউ বুঝতে রাজি নয়, বাসার মানুষের ধারণা, "ও আমাকে পাঠিয়েছে ত্রিশ হাজার মানে ওর কাছে আছে পঞ্চাশ হাজার।" এক মাসে টাকা পাঠাতে সমস্যা হয়েছে তাই শুনতে হয়েছে, "এতো টাকা দিয়ে কি করোস?"


ব্যাংকে জমাইছোস কত? বউ টাকা পাঠাতে দেয় না?" এটা কেবল একজন প্রবাসীর দৃশ্য নয়, আমার মনে হয় প্রতিটা প্রবাসীই বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের কাছে "টাকার মেশিন" হিসেবে বিবেচ্য। কিন্তু কেন? হ্যাঁ, দেশের হিসাবে মাসে আমার আয় লাখ টাকা হতেই পারে। সেক্ষেত্রে ব্যয়টাওতো দেশের হিসাবেই দেখতে হবে, তাইনা? আমি যদি বাহিরে পরার জন্য গুন মান বিচার না করে এক জোড়া জুতা কিনতে যাই তবে আমাকে হাতে রাখতে হবে বাংলাদেশী টাকায় ন্যূনতম দুই হাজার টাকা।

বাসায় পরার স্যান্ডেলের দামই ৪০০-৫০০ টাকা। যেহেতু আমি ইউরোপের স্টাইলের পোশাক পরি না তাই আমার পছন্দের ধাচে জুতসই পরনের জামা কিনতে জামা প্রতি বাজেটে রাখতে হয় দেশীয় টাকায় তিন হাজার টাকা। আমি যদি অফিসিয়াল গেট আপ মেইনটেইন করার জন্য শপিং করতে যাই তবে আমার ব্যাগে অবশ্যই দেশীয় মানে ত্রিশ হাজার টাকা থাকতে হবে, অন্যথায় পছন্দের পোশাকের প্রাইস ট্যাগের সাথে পার্সের অংকটা সাংঘর্ষিক আচরণ করে মেজাজ খারাপ করিয়ে দেবে।

নিত্য প্রয়োজনীয় খাবারের জিনিসে আসি, যা কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়৷ তাদের দেশীয় মূল্য কতো আসে?

তেলঃ লিটার প্রতি সর্বনিম্ন ১৫০-১৭০ টাকা

চালঃ পাঁচ কেজি ১৫০০ টাকা

মসুর ডালঃ এক কেজি ২৫০ টাকা

কাঁচামরিচঃ ১০০০-১৫০০ টাকা কেজি

চিনিঃ কেজি ১৫০ টাকা

ডিমঃ সবচেয়ে ছোট সাইজের পনেরোটি ২৫০ টাকা

টমেটোঃ ২০০ টাকা

এক আটি ধনে পাতাঃ ১০০ টাকা

সত্যি বলতে সবজি আমি যেটাই কিনিনা কেন কেজিতে সর্বনিম্ন তিনশ টাকা।

গরুর মাংসঃ বুকের পার্ট ৫০০ টাকা কেজি, অন্যান্য পার্টের দাম আটশ থেকে হাজার কিংবা তারও বেশি।

মুরগিঃ আস্তটা চারশ টাকা কেজি দিয়ে শুরু।

মুরগির গিলা/কলিজাঃ ৪০০ টাজা কেজি।

মাংস খেতে গেলে শসা আর লেবু খেতে মন চায়। শসা একটার দাম সত্তর টাকা, পিচ্চি পিচ্চি দুটো লেবু একশ টাকা। কিন্তু কতোকাল আর একই খাবার খেতে ভালো লাগে? ইচ্ছে হলো একটু করল্লা ভাজি খাবো। করল্লার দাম কেজিতে ১৫০০ টাকা বা তারও বেশি তবুও নিয়মিত পাওয়া যায় না।

ঢেঁড়স খাবো এক হাজার টাকা কেজি। বেগুন কিনতে গেলেও কেজি প্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা। আলু ১০০ কিংবা ১২০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ১০০ টাকা, রসুন পাঁচশো গ্রাম ৩০০ টাকা অর্থাৎ কেজি ৬০০ টাকা। পাউরুটি সর্বনিম্ন ১২০ টাকা। সস ১২০ টাকা তাও ২৫০/৩০০ গ্রাম। দুধ লিটার প্রতি ১০০ টাকা। যাতায়াত খরচ মাসে চোখ বন্ধ করে দশ হাজার টাকা।


শেয়ার বাসায় এক রুম নিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে থাকতে গেলেও এখানে একজন মানুষকে গুনতে হয় সর্বনিম্ন পঞ্চাশ হাজার টাকা তাও সিটি থেকে অনেক দূরে। এই হিসাবটা আমি এক ক্রোনা= দশ টাকা হিসাবে করলাম কিন্তু বর্তমানে এক ক্রোনা= নয় টাকারও কম। তাহলে টাকার হিসাবে দাম আরও বাড়বে। এখন যার আয় এক লাখ টাকা তার বাসা ভাড়া আর যাতায়াতেই চলে যায় ষাট হাজার টাকা। বাকি থাকলো চল্লিশ হাজার। যেখানে তিনশ টাকা কেজির নিচে কোন সবজি নেই সেখানে মাসে একজন মানুষের বাজার খরচ কতো লাগতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

আর গদ বাঁধা খাবার কয়দিনই খেতে ভালো লাগে? শুধু খেলে আর পরলেই হয়? বিনোদনের প্রয়োজন নেই? সখ নেই? এসবকিছু সত্ত্বেও প্রবাসীরা তাদের দেশের স্বজনদের চাহিদা মেটাতে টাকা পাঠায়। নিজেকে কষ্ট দিয়ে হলেও তারা চায় তাদের স্বজনেরা ভালো থাকুক। কিন্তু আপনারা যারা প্রবাসী মানেই লাখ লাখ টাকা আয় হিসাব করে তার কাছে আকাশ কুসুম দাবি নিয়ে বসে থাকেন তারা অন্তত এইটুকু হিসাব মাথায় রাইখেন যে প্রবাসীদের জীবনধারণের ব্যয়টাও লাখ টাকাতেই হতে হয়।



আপনার দেশীয় টাকায় ত্রিশ হাজার টাকা বেতন থেকে পাঁচশো টাকা সঞ্চয় করতে যেমন ঘাম ছুটে যায় তেমনি প্রবাসীদেরও এক লাখ টাকা আয় থেকে পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে ঘাম বেড়িয়ে যায়। সত্যি বলতে সুইডেনে এক লাখ টাকা দিয়ে যেরকম জীবনধারণ করা যায় তা আমাদের দেশে দশ পনেরো হাজার টাকা বেতন পাওয়া লোকের আয়ের জীবনধারণের সমান কিংবা তার থেকেও কম।

চাওয়া পাওয়ার হিসাবে একটু গড়মিল হলেই মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হয়, দেশেতো তাও স্বজনদের কাছ থেকে ধার নেয়া যায় এই প্রবাসে কে কাকে আগলে রাখার জন্য বসে থাকে? দেশে কারও থেকে সাহায্য চাইবে তারও উপায় নেই কারণ আপনারা সেই সুযোগ রাখেন না। আপনাদের ভাবগতি এমন যে বিদেশ থেকে শুধু বাংলাদেশে টাকা পাঠানো যায়, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাঠানো সম্ভব নয়। আপনারা প্রবাসীর কাছে সমস্যা বলবেন মানে তিনি আপনাকে টাকা পাঠিয়ে দেবেন আর প্রবাসী কোন সমস্যা আপনার কাছে বললো মানে এক গাদা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে দেবেন ক্ষেত্র বিশেষে "টাকা খরচ হয় কই?"

এ নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন কিন্তু তাদেরকে টাকা পাঠিয়ে সাহায্যের কথা খুব কম মানুষের মাথাতেই আসে। সত্যিতো এটাই যে আপনার টাকার সমস্যা যেমন টাকা ছাড়া সমাধান হয় না তেমনি প্রবাসীদেরটাও হয় না। আপনার মুখে এমন কোন জাদু নেই যে আপনার বলা সান্ত্বনার বাণীতে প্রবাসীর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ব্যাপারগুলো বিবেচনায় রাখবেন দয়া করে। উলটাপালটা দাবি চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে বিবেকহীন পরিচয় দেবেন না। হ্যাঁ, প্রবাসে আসে মানুষ স্বচ্ছল জীবন যাপনের জন্য কিন্তু সেটা আসা মাত্রই হয়ে যায় না। তাকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য আপনাকে সুযোগ দিতে হবে। বছর কয়েক অপেক্ষা করতে হবে, তার সুযোগ সুবিধা দেখতে হবে।

ছেলে বিদেশে আসার আগে যদি পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে চলতে পারেন তবে বিদেশে আসার পর ছেলের পাঠানো মাসে ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা পাওয়ার পরেও কেনো চলতে পারেন না? সমস্যাটা কি ছেলের পাঠানো টাকায় নাকি আপনার চাহিদায়? এতো টাকা টাকা করে মাথা পাগল করে দিয়েন না। প্রবাসীরা টাকার মেশিন না, তাঁদেরও কষ্ট করেই টাকা আয় করতে হয়।


প্রবাসীরা হচ্ছে দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধা তাদের কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়ে একদিকে যেমন তাদের পরিবার সচ্ছলতার মুখ দেখে অন্যদিকে দেশ ও উপকৃত হয় তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাতে অবদান রাখে। প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থ উপার্জনের জন্য অনেক বেকার তরুণ যুবক পাড়ি জমায় এবং সেখানে গিয়ে তাদের আশার প্রতিফলন ঘটায়

Sites