একসময় বলা হত মাছের দেশ বাংলাদেশ, মাছে ভাতে বাঙালি সহ কিছু কথা,কিন্তু বর্তমান সময়ে এই এই কথার সাথে কোন সাদৃশ্য খুজে পাওয়া যায় না।একসময় যেমন মানুষের পুকুর ভরা মাছ গোয়াল ভরা গরু এই মুলকথা ছিল এখন দৃশ্যপট পুরোটাই পাল্টেছে।বর্তমান মানুষ সময়ের সাথে সাথে অনেক পাল্টেছে সেই সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার চির চেনা ঐতিহ্য।


গত শুক্রবারে বাড়ি গিয়েছিলাম প্রাইমারি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সাথে মিলিত হতে। আগামী ঈদের পরদিন আমরা এক পুনর্মিলনী করতে যাচ্ছি আমাদের প্রিয় প্রাইমারির মাঠে। সেদিন দুপুরে আমরা খাবো জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী পিঠালী আর সাদা ভাত। মিটিং এ এসে সবাই আক্রান্ত হই নষ্টালজিয়ায়। মিটিং এর পর দুই বন্ধুর সাথে রাত অবধি আড্ডা দিলাম নতুন বাইপাস রোডে। ওরা চলে গেলে আমি সদরউদ্দিন ফিলিং ষ্টেশনে বসেছিলাম। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে জামালপুরে। রাস্তার দুইপাশে পানি আর পানি। এই সুন্দর রাস্তাটা হয়েছে সম্প্রতি। এখনো ব্যস্ত হয়ে উঠেনি। এর আগে বর্ষায় পুরা মাঠটাই পানিতে তলিয়ে যেত। ছেলে বেলায় আমরা কলাগাছের ভেলায় ভাসতাম সারা মাঠে। ঠান্ডা হাওয়ায় আমি প্রাণ ভরে খোলা মাঠের নিঃশ্বাস নিচ্ছি। একটু পর দেখি দুই ছেলে ট্যাটা আর টর্চ নিয়ে মাছ ধরতে এসেছে। আমি আশ্চর্য হলাম। এখনো এসব দিয়ে মাছ ধরে? বা এখনো কি মাঠে মাছ থাকে? আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করাতে জানাল, গতরাতে সে প্রায় এক ব্যাগ শিং মাছ ধরেছে। আজ সে মাত্র এসেছে। কয়েকটা টাকি মাছ সে আমাকে ব্যাগ খুলে দেখাল।

আমি আমার অতীতে ফিরে গেলাম। আমাদের বছর বান্ধা(এক বছরের জন্য চুক্তি ভিত্তিক) কামলা ছিল আজিজ। আমি তাকে ’চাচা’ বলে ডাকতাম। সে ছিল রাতে মাছ ধরার ওস্তাদ। তার সাথে আমি মাছ ধরতে বের হতাম রাত ২/৩ টার দিকে। তার দেয়া রাতের সে সময়ের নামটা ভুলে গেছি। তার মতে ঐ সময়ই ছিল মাছ ধরার উপযুক্ত সময়। এজন্য আমি তার সাথে মাঝে মাঝে গোয়াল ঘরেও থেকেছি যাতে আব্বা/ আম্মা আটকিয়ে না রাখতে পারে। চারদিকে নিঝুম রাত। আমার হাতে থাকতো বাগি দা (কাস্তের মত লম্বা দা) আর আজিজ চাচার হাতে থাকত হ্যারিকেন বা টর্চ আর ট্যাটা। তার কোমড়ে বাধা থাকত মাছ রাখার খলই। আমি ছোট থাকায় ট্যাটায় ততটা এক্সপার্ট ছিলাম না। বিষয়টা অনেক মজার ছিল। মাছের চোখে টর্চ বা হ্যারিকেনের আলো পড়লেই সে পিটপিট করে তাকিয়ে থাকত। কোন নড়াচড়া করতনা। আমি লম্বা কাস্তের মত দা টা দিয়ে কোপ দিয়ে মাছটা চেপে ধরতাম। কখনো কখনো দু-টুকরো হয়ে মাছগুলো কাঁপতে থাকত। কি বিভৎস ছিল ব্যাপারটা, কিন্ত তখন সেসব ভাবনায় আসেনি। এখন মাছ বাজারে যখন মাছওয়ালা কাঠের শক্ত লাঠিটা দিয়ে শোল বা কৈ মাছের মাথায় ঠাস্ ঠাস্ বারি দেয় আর মাছটা কাঁপতে কাঁপতে মারা যায়, তখন খারাপই লাগে।

যাহোক, আমরা রাতে এভাবে মাছ ধরতাম অল্প পানিতে- ধানের ক্ষেতে, রেল লাইনের আর রাস্তার পাশ ঘেঁষে। একদিন আমরা ধানক্ষেতে ট্যাটা দিয়ে মাছ ধরছিলাম। প্রচুর মাছ পাচ্ছি। সামনে মাছের টুপটাপ ঘুলি মারার শব্দ। আমরা আরো সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। এভাবে আমরা হাটু পানিতে নেমে গেলাম। ছোট ট্যাটা বা দা দিয়ে এই গভীরতায় মাছ ধরা যায়না। কিন্ত আমরা এগিয়ে যাচ্ছি মাছের নেশায়। হঠাৎ আজিজ চাচা আমাকে হাত ধরে পেছনে চলে আসল। আমরা সোজা বাড়ি ফিরে আসলাম। পরদিন সে আমাকে বলল, আমরা যদি আরো গভীরে যেতাম তাহলে পেত্নী(?) আমাদের পানিতে ডুবিয়ে মারত। পেত্নী আমাদের মাছের লোভ দেখিয়ে গভীর পানিতে নিয়ে যাচ্ছিল। কি ভয়ংকর কথা!
জায়গাটা ছিল আমি যেখানটায় চেয়ারে বসে ছিলাম এর আশে পাশেই।



অতিতে গ্রাম বাংলায় দেখা যেত টোটা দিয়ে মাছ শিকার, রাতের আধারে টর্চলাইট বা অনান্য সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে পড়ত অনেকেই,অন্যরকম ভাললাগা কাজ করত এই মৎস শিকারকালে, সময়ের সাথে সাথে আজ সেগুলো প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।

Sites