বিল গেটস। নামটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেকদিনের। আজকে এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আমরা যে এতটা আধুনিক সভ্যতা দেখছি, তার অন্যতম পথিকৃৎ এই মানুষটি। কম্পিউটার না থাকলে কি হতো বলুন তো? আমরা কি সত্যিই এতোটা এগোতে পারতাম? না পারতাম না… আর তাই বি ল গেটসেরকাছে আজকের সমাজ কৃতজ্ঞ। প্রয়াত স্টিভ জোবস অবশ্যই লেজেন্ড। তাঁর সৃষ্টি অ্যাপল ম্যাক আছে বটে। তবে, তা ধনীদের জন্য। বিশ্বের সবপ্রান্তে কম আয়ের নামুষের ঘরে ঘরে আজ কম্পিউটার মাইক্রোসফ্টের দৌলতেই।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একসময়কার স্কুল ড্রপআউট ছেলেটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ। ফোর্বসের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে গেটসের সম্পত্তির পরিমাণ আট হাজার ছ\’শো কোটি মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ওয়ারেন বাফেট অনেকটাই পিছিয়ে। ওয়ারেনের মোট সম্পত্তির পরিমাণ সাত হাজার পাঁচশো ষাট কোটি মার্কিন ডলার। ফোর্বস প্রতিবছরই এই তালিকা প্রস্তুত করে থাকে বিশ্বের ধনীর ব্যক্তিদের নিয়ে। তাতে মার্ক জুকারবার্গ, জেফ বেজসের মতোও ব্যক্তিরাও জায়গা করে নেন প্রতিবছরই।


তবে, জানলে অবাক হবেন, এমন একজন ব্যক্তিও আছেন এই পৃথিবীতে যিনি গেটস, ওয়ারেন, জুকারবার্গের চেয়েও অনেক বেশি আয় করেন। তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ একলক্ষ কোটি মার্কিন ডলারেরও অনেক বেশি। যদি বলি, ওই ধনকুবের ব্যক্তি ভারতীয়, তাহলে আরও অবাক হবেন… আপনি হয়ত ভাবছেন, ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি তো মুকেশ আম্বানি। ফোর্বসের তালিকা তাই বলে। আর তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ গেটসের থেকে অনেকটাই কম।



তাহলে বলি শুনুন… ভারতের বহুজাতিক কোম্পানি বা ভারতীয় শিল্প বললে, আমাদের সবার আগে যে কোম্পানি বা যে পরিবারের কথা মাথায় আসে, সেটা হলো টাটা। টাটা গ্রুপ অফ ইন্ডিয়া। ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে এই কোম্পানি ভারতের নাম উজ্জ্বল করে আসছে। আর এই কোম্পানির চেয়ারম্যান রতন টাটা হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ বিল গেটসের থেকেও বেশি আয় করেন।



১৮৬৮ সালে জামশেদজি টাটা এই কোম্পানিটি স্থাপন করেন। বিশ্বের নানান কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আন্তর্জাতিক খ্যাতি আদায় করে নেওয়া শুরু তারপর থেকেই। বর্তমানে ভারতের বাজারে পাঁচটি শীর্য স্থানীয় কোম্পানির নাম ঘাঁটলে দেখা যাবে তার মধ্যে চারটি টাটা গোষ্ঠীর। এর পাশাপাশি আরও ছিয়ানব্বইটি কোম্পানি চালাচ্ছে টাটা গোষ্ঠী। এছাড়া, আরও তিরিশটি কোম্পানি রয়েছে, যেগুলি সরাসরি টাটা গোষ্ঠীর নামে নিবন্ধিভুক্ত। টাটা স্টিল, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস, টাটা কেমিক্যালস, টাইটান, টাটা কমিউনিকেশন, তাজ গ্রুপের মতো নামিদামি কোম্পানিগুলি আমাদের অতি পরিচিত নাম। টাটা গোষ্ঠীর সবকটি কোম্পানির বাণিজ্যিক লগ্নি করা পুঁজির পরিমাণ ছেড়ে রাখুন, মোট সম্পত্তির পরিমাণ এক লক্ষ তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার।



এই তথ্য দেখার পর স্বাভাবিকভাবে আমার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে রতন টাটার নাম নেওয়া হয় না কেন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ হিসেবে?

ভারতীয় হিসেবে আমরা টাটা গোষ্ঠীকে নিয়ে গর্বিত। জন্মের পর থেকে যদি কোনও একটি নাম শুনে থাকি, তাহলে সেটা হলো এই টাটা। শতাব্দী প্রাচীন এই কোম্পানিটির কোনও না কোনও উৎপাদিত বা বিক্রিত দ্রব্য আমাদের রোজ কাজ লাগে। সবচেয়ে সহজ করে বললে, আমাদের মাথায় আগেই আসবে টাটা চা আর টাটা নুনের নাম। অতি দরিদ্র থেকে শুরু করে অতি ধনী – সবার ঘরেই টাটার বিক্রিত দ্রব্যের প্রবেশ। তা সত্ত্বেও কেন ধনী নন রতন টাটা? টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হিসেবে সবই তো তাঁর…!



আসলে টাটা পরিবার এবং কোম্পানির ৬৫ শতাংশ লভ্যাংশই দান করে দেওয়া হয়। আর এই কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ হয়েও ধনী নন আমাদের রতন টাটা। টাটা গোষ্ঠীর লাভের কোনও অর্থই রতন টাটার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা হয় না। সব অর্থই সরাসরি অনুদান হিসেবে চলে যায়। শুনলে আরও অবাক হবেন, রতন টাটার ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ একশো কোটি মার্কিন ডলারও নয়। কোনও কালে একবারও তা ছাড়ায়ওনি। ১৯৯১ সালে টাটা গোষ্ঠীয় চেয়ারম্যান হন রতন টাটা। তাঁর আমলে কোম্পানির ব্যবসায়িক আয়ের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে পঞ্চাশ শতাংশ।



পুরো টাটা পরিবারের মহৎ কাজের সঙ্গে জড়িত। আর এই প্রথা নতুন নয়, কোম্পানির জন্মলগ্ন থেকেই চলে আসছে। রতন টাটার চেয়ারম্যান হওয়ার পর চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরও অনুদান বাড়ানো হয়েছে। তার পাশাপাশি সবার সমানাধিকার, শিক্ষা ব্যবস্থা, ক্রীড়া এবং দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে রক্ষণা-বেক্ষণের কাজেও প্রচুর অর্থ খরচ করা হচ্ছে। আর চ্যারিটি ওয়ার্ক বা দানছত্র, যাই বলুন না কেন, তা শুধু দেশের মধ্যেই সীমিত নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও টাটা গ্রুপ প্রচুর অর্থ দান করে। হাভার্ড বিজনেস স্কুলকে প্রতিবছর পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে দেয় টাটা। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দুশো কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনুদান হিসেবে পাওয়া সবথেকে বেশি পরিমাণ অর্থ এটি। ২০০৭ সালে টাটা গ্রুপ\’কে এজন্য কার্নেগি মেডাল অফ ফিলানথ্রোপি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।



রতন টাটা মানব কল্যাণে এতোটাই নিয়োজিত, যে সাধারণ মানুষও যাতে নিজের ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুবিধা নিতে পারেন, সেজন্য এক হাজার টাকারও কমদামে একটি ওয়াটার-পিউরিফায়ার বাজারে এনেছেন। বিদেশের বাজারে মার্কিন ডলারে এর পরিমাণ মাত্র ২১ ডলার।



রতন টাটার একবার বলেছিলেন, \"আমি সমস্ত কোম্পানি মিলিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান রেখে যেতে চাই, যেটি নীতি, মূল্য দিয়ে কাজ করে উদাহরণ সৃষ্টি করবে এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে কাজ শুরু করেছিল, সেটা আগামী দিনেও চালিয়ে যাবে।\"



অনুদানে এতো অর্থ বিলিয়ে দেওয়ার পরেও, নিজের কর্মচারীদের প্রতি খেয়াল রাখে টাটা গোষ্ঠী। আধুনিক ধাঁচে পেনশন প্ল্যান রয়েছে। রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসার খরচ এবং আরও অনেক পরিষেবা দেওয়া হয় সারা ভারতে টাটার কোম্পানিগুলিতে কাজ করা সমস্ত কর্মচারীকে।

বাণিজ্য নগরী মুম্বইয়ের তাজ হোটেলে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর, রতন টাটা তাঁর কর্মচারীদের ভুলে যাননি। মেরামতির সময় হোটেল বন্ধ ছিল বলে, ওই হোটেলের কোনও কর্মচারীই আর্থিক সমস্যায় পড়েননি। সময় মতো মাসে মাসে প্রত্যেককেই মাইনে দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে রেলে কাজ করা কর্মচারীদের, পুলিশ থানাগুলি, সব্জি বিক্রেতা এবং পথচারীদেরও ক্ষতিপূরণ দিয়েছে টাটা।



সম্প্রতি রতন টাটা জানিয়েছেন, এবার তাঁর লক্ষ্য ভারতকে ম্যালেরিয়া মুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। আর এর জন্য সাত কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। বেঙ্গালুরুতে দ্য টাটা ইনস্টিটিউট অফ জেনেটিক্স এ্যান্ড সোসাইটি গড়ে তোলা হবে। সেখানে ভারতে যেসব মশা জন্ম নেয়, তাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণা চালানো হবে দেশকে ম্যালেরিয়া মুক্ত করার লক্ষ্যে। আর এই সংস্থার ট্রাস্টি হবেন রতন টাটা নিজেই।

মানব সেবায় ব্রতী টাটা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানগুলি এক নজরে দেখে নিন –

দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান)
দ্য জেআরডি টাটা ইকোটেকনোলজি সেন্টার
ন্যাশনাল সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্টস
টাটা সেন্টার ফর টেকনোলজি অ্যান্ড ডিজাইন (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি)
টাটা সেন্টার ফর টেকনলজি অ্যান্ড ডিজাইন (আইআইটি বম্বে)
টাটা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি
টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমি
টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্স
টাটা ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং সেন্টার
টাটা মেডিক্যাল সেন্টার (২০১১ সালে ১৬ মে রতন টাটা উদ্বোধন করেন)
টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল
টাটা ট্রাস্টস (মানবসেবার ব্রতী বেশ কয়েকটি সংগঠন)
টাটা ক্যান্সার হসপিটাল


ব্যক্তিগত ঐশ্বর্য বৃদ্ধি নয়, মানব সেবাই পরম ধর্ম টাটা পরিবারের শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য। আর এই কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ধুনকুবের না হয়েও, মানুষের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা এবং সম্মান পান রতন টাটা।

Sites