চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের দেয়া ঘুষ দুর্নীতি সংক্রান্ত এক বক্তব্য টক অব দ্য কান্ট্রিতে রূপ নিয়েছে। তোলপাড় চলছে প্রশাসনজুড়ে। সবার কৌতূহলের আগ্রহ এখন কোন সে কর্মকর্তা যিনি মেয়র নাছিরের কাছে ঘুষ বাবদ একটি পাজেরো জিপ চেয়েছিলেন; বলেছেন, প্রকল্প ব্যয়ের ৫ শতাংশ কমিশন হিসেবে দিলে ৮০ কোটি টাকার পরিবর্তে ৩০০ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া যাবে।
চট্টগ্রামে বুধবার এই ‘বোমা বক্তব্য’ ফাটানোর পর বৃহস্পতিবার তা দেশজুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে।
এদিকে তথ্য প্রমাণসহ গুরুতর এই অভিযোগের ব্যাখ্যা চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে গতকালই মেয়র নাছিরের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। যদিও একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে মেয়র আ জ ম নাছির বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত ছিলেন। তবে এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব সাংবাদিকদের কাছে যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তার সারমর্ম হল- এটি তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়। এছাড়া মেয়র নাছিরকেই তার অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর থিয়েটার ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘কিছুদিন আগে মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এসেছিলেন। তিনি একটি নতুন পাজেরো জিপ চান। সেটি দিলে নাকি চসিকের প্রকল্প অনুমোদন বা পাসে কোনো সমস্যা হবে না। এছাড়া প্রকল্প বরাদ্দের ৫ শতাংশ দিয়ে দিলে যত বরাদ্দ চাইব পাব।’
জানা গেছে, মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের এমন অভিযোগের ব্যাখ্যা চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কোন কর্মকর্তা, কখন, কোথায় এ ঘুষ চেয়েছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে উপযুক্ত প্রমাণসহ আগামী ৭ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) জ্যোতির্ময় দত্ত স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
চট্টগ্রামের মেয়রকে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ পেতে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘুষ চান। মন্ত্রণালয়ের জনৈক যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা আপনার কাছে একটি নতুন পাজেরো জিপ চেয়েছেন। ৫ শতাংশ ঘুষ দিলে আপনি ৮০ কোটি টাকার পরিবর্তে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতেন বলে ১০ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছেন।
চট্টগ্রাম থিয়েটার ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে রাখা এ বক্তব্য ১১ আগস্ট বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। আপনার আনীত অভিযোগগুলো গুরুতর। এতে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে, যার প্রমাণ প্রদান আবশ্যক। এ পরিপ্রেক্ষিতে কোন কর্মকর্তা কোথায় কখন আপনার কাছে ঘুষ দাবি করেছেন? কে কখন কোথায় পাজেরো জিপ চেয়েছেন? কোন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে কোন কর্মকর্তা জটিলতা সৃষ্টি করেছেন?’ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে উপযুক্ত প্রমাণসহ আগামী ৭ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করার জন্য অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।
এদিকে মেয়র নাছিরের এমন বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই স্থানীয় সরকার বিভাগসহ প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে এটিই ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সকালে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী দফতরে এসেই সচিবকে ডেকে পাঠান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মেয়র আলোচনা সভায় প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। এজন্য তাকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেন। স্থানীয় সরকার সচিব বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন জানিয়ে সচিবকে এ বিষয়ে শোকজ করতে বলেন। এরপর শুরু হয় নথি চালাচালি। প্রস্তুত করা হয় শোকজ লেটারও। বেলা ১১টায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে কোরবানির পশু জবাই সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বৈঠকে অন্য সিটি মেয়রদের সঙ্গে চট্টগ্রামের মেয়রও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে এ বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, বিষয়টি আদৌ চট্টগ্রামের মেয়র বলেছেন কিনা, তা জানতে হবে। মন্ত্রী বলেন, ঘটনা সত্য হলে এটি গুরুতর অপরাধ। এর সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে।
এদিকে বৈঠক শেষে বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছিরকে ঘিরে ধরেন সাংবাদিকরা। এ সময় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মেয়রকে নিজ কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে ২০ থেকে ২৫ মিনিট সচিবের সঙ্গে একান্ত কথা বলেন মেয়র নাছির।
একান্ত বৈঠকের পর স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবদুল মালেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। হি মাস্ট এক্সপ্লেইন, পরিষ্কার কথা।’
নাছিরকে ওই অভিযোগের ‘প্রমাণ দিতে হবে’- এমন মন্তব্য করে স্থানীয় সরকার সচিব বলেন, ‘তিনি যা বলেছেন, সে বিষয়ে আমরা তার কাছে জানতে চাইব, প্রমাণও চাইব।
মন্ত্রণালয়ের কোন কর্মকর্তা তার কাছে জিপ চেয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি প্রমাণ দেবেন। তিনি যার কথাই বলুন, সেটা উনি বলুক। উনি যে কথাগুলো বলেছেন, উনি একজন রাজনৈতিক নেতা এবং একজন মেয়র…। সুতরাং উনার বক্তব্য উনিই স্যাটেল করুক। আমরা আজই (বৃহস্পতিবার) উনার কাছে ব্যাখ্যা চাচ্ছি।’
এ বিষয়ে মেয়র নাছির কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্লিজ! আমাকে মাফ করেন। এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না।’ পরিকল্পনা কমিশনের কোনো যুগ্ম সচিবের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন কিনা- জানতে চাইলে নাছির ‘না’ সূচক জবাব দেন। তাহলে কি স্থানীয় সরকার বিভাগের কোনো যুগ্ম সচিবের কথা বলছেন? এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চুপ থাকেন। মন্ত্রণালয় থেকে কোনো শোকজ পেয়েছেন কিনা- এমন প্রশ্নেও তিনি ‘না’ সূচক জবাব দেন।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘আমার কোনো প্রজেক্টে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি, আমি এটা বলতে পারি। উনি (মেয়র নাছির) যেহেতু অভিযোগ করেছেন উনিই এ ব্যাপারে বলতে পারবেন’। তবে চট্টগ্রামের মেয়রের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন আইভী।
নাছিরের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘ওই ধরনের কিছু’ তিনি শোনেননি। তার ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ঘটনাও ঘটেনি। তবে এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা উচিত।
এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দু’জন কর্মকর্তা যুগান্তর প্রতিবেদককে বলেন, ‘তারা একজন যুগ্ম সচিবকে ঘিরে সন্দেহ করছেন। তাদের মতে, এ ধরনের প্রস্তাব দিয়ে থাকলে ওই কর্মকর্তা দিয়ে থাকতে পারেন।’ এরপর তাদের সন্দেহভাজন যুগ্ম সচিবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সিটি কর্পোরেশন দেখি না। অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত নই। সে কারণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বা মেয়রের সঙ্গে অফিসিয়াল কোনো ধরনের যোগাযোগ হওয়ার সুযোগই আমার নেই।’
যেহেতু এ বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপনকারী চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করেননি, সেহেতু নীতিগত প্রশ্নে সন্দেহভাজন কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করা হল না।

Sites